বাড়িতে সহজে গাজর চাষ

প্রকাশিত ১৬ মার্চ, ২০১৮ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর, ২০২০

আসুন জেনে নেই বাড়ির চিলেকোঠা বা ছাদে অথবা ঘরের বারান্দায় অথবা বাড়ির আঙ্গিনায় বা উঠোনে কিভাবে গাজর চাষ করতে হবে

গাজর আমাদের দেশে একটি অতিপরিচিত সবজি। শীতকালীন সবজি হিসেবে গাজর যেমন পরিচিত তেমন জনপ্রিয়ও বটে। এর ইংরেজি নাম Carrot। গাজর একটি মূল জাতীয় সবজি। এটি একটি পুষ্টিকর সবজি এবং অনেকেই এই সবজি পছন্দ করেন। আপনিও ইচ্ছা করলে আপনার চিলেকোঠা বা ছাদে অথবা ঘরের বারান্দায় অথবা বাড়ির আঙ্গিনায় বা উঠোনে গাজর চাষ করতে পারেন। আসুন জেনে নেই কিভাবে চিলেকোঠা বা ছাদে অথবা ঘরের বারান্দায় অথবা বাড়ির আঙ্গিনায় বা উঠোনে গাজর চাষ করতে হবে।

কিভাবে গাজর চাষে টব/মাটি তৈরি করবেন 

বাড়ির ছাদে বা উঠানে বা আঙিনায় গাজর চাষ করার জন্য আপনি ইচ্ছা করলে যেকোন ধরণের মাটিতে গাজর চাষ করতে পারেন। তবে গাজর চাষ করার জন্য বেলে দো-আঁশ মাটি সবচাইতে ভাল। এবং খেয়াল রাখতে হবে এক্ষেত্রে ঝুরঝুরে মাটি হতে হবে।

গাজর চাষে কি ধরণের টব/পাত্রের আকৃতি বাছাই করবেন 

গাজর চাষের জন্য সঠিক মাপের পাত্র নির্বাচন করতে হবে। এক্ষেত্রে মাঝারি সাইজের টব বা ড্রাম ব্যবহার করতে পারেন। তবে যে পাত্রই নির্বাচন করুন না কেন খেয়াল রাখতে হবে পাত্রের বা টবের পানি যেন   দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারে সে ব্যবস্থা রাখতে হবে। সাধারণত ছাদে গাজরের চারা লাগানোর জন্য ১০-১২ ইঞ্চি মাটির টব ব্যবহার করাই উত্তম। টবের তলার ছিদ্রগুলো ইটের ছোট ছোট টুকরা দিয়ে বন্ধ করে দিতে হবে।

গাজরের জাত বাছাই করা  

আমাদের দেশে সাধারণত দুই ধরণের গাজর চাষ করা হয়ে থাকে। একটি হল গ্রীষ্মকালীন এবং অপরটি নাতিশীতোষ্ণ। কালো, লাল, বেগুনে ও হলদে বিভিন্ন রঙে পাওয়া যায়। গ্রীষ্মকালীন জাতের মধ্যে রয়েছে পুসা কেশর, পুসা মেঘালি ও অরেঞ্জ জিনো।

গাজর চাষ/রোপনের সঠিক সময় 

ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় গাজর ভালো জন্মে। সাধারণত নভেম্বর মাসে গাজরের বীজ বপন করা হয়। সমতল অঞ্চলে আগস্ট থেকে ডিসেম্বর ও পাহাড়ি এলাকায় মার্চ থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত বোনা যায়। আগাম ফসল উৎপাদনের জন্য সেপ্টেম্বর মাসে বীজ বপন করা যায়। তবে অক্টোবরের শেষ ভাগ থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত বীজ বপন করা যেতে পারে।

কিভাবে গাজরের বীজ বপন ও সঠিক নিয়মে পানি সেচ দিবেন

গাজরের বীজ বপনের আগে বীজ একদিন ভিজিয়ে রাখতে হবে। গাজরের বীজ খুব ছোট হয়, তাই বীজ বপনের সময় বীজের সাথে ছাই বা মাটি গুঁড়া মিশিয়ে নিতে হবে। বীজ ছিটানোর আগে বীজ সকালে ভিজিয়ে রেখে বিকেলে বপন করতে হবে। বীজ ছিটানোর পর মাটি নেড়ে দিতে হবে। চারা গজানোর পর ছোট ছোট চারা গুলি উঠিয়ে ফেলে দিতে হবে এবং মাঝে মাঝে নিড়ানি দিতে হবে। তারপর সেচ দিতে হবে। ছাদে চাষ করার জন্য পানি দিতে হবে। তাহলে, ফলন ভালো পাওয়া যাবে।

সঠিক নিয়মে গাজর চাষাবাদ পদ্ধতি/কৌশল

গুণগত মানসম্পন্ন ভালো ফলন পেতে হলে গাজর চাষের জমিতে যতটুকু সম্ভব জৈব সার প্রয়োগ করতে হবে। গাজর চাষে আগাছানাশক কার্যকরী। শুষ্ক ও বেশি আর্দ্র ২ রকম জমিই গাজর চাষের পক্ষে ক্ষতিকারক। কাজেই জমিতে পানির চাহিদা বুঝে সেচ দিতে হবে। এবং সঠিক নিয়মে পানি দিতে হবে। 

গাজর চাষে সারের পরিমাণ ও সার প্রয়োগ 

গাজর চাষে  আপনি বাড়িতে তৈরি জৈব সার দিতে পারেন। যেমন গোবর সার, কম্পোস্ট, কেঁচো সার,  তরকারীর খোসা, ময়লা আবর্জনা, ইত্যাদি। এছাড়াও আপনি অজৈব সার হিসেবে পাত্রের মাটিতে গোবর, টিএসপি, ও এমওপি দিতে পারেন। এছাড়া গাজরের চারা গজানোর পর ১০ গ্রাম ইউরিয়া ছিটিয়ে দিতে হবে।

গাজর চাষে পোকামাকড় দমন ও বালাইনাশক / কীটনাশক কিভাবে প্রয়োগ করবেন

গাজরে খুব একটা রোগ বালাই ও পোকামাকড় দেখা যায় না। তবে অনেক সময় লীফ হপার পোকার মাধ্যমে গাজরে হলুদ ভাইরাস রোগ দেখা যায়। এর আক্রমণে গাজরের ছোট বা কচি পাতাগুলো হলুদ হয়ে কুঁকড়িয়ে যায়। পাতার পাশের ডগাগুলো হলুদ ও বিবর্ণ হয়ে যায়।  এছাড়াও গাজরের আরও কিছু রোগ যেমন জাবপোকা। এই পোকা গাজরের পাতা ও গাছের কচি অংশের রস চুষে খেয়ে ফসলের অনেক ক্ষতি করে। পচারোগ- মূল ও পাতার গোড়ায় ব্যাক্টেরিয়াজনিত পচন রোগ দেখা যায়। নাইট্রোজেন সার অতিরিক্ত প্রয়োগে এ রোগ বেড়ে যায়।  এসব রোগ থেকে গাজরকে রক্ষা করতে হলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত জৈব কীটনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে।

গাজর চাষে কিভাবে বাগানের যত্ন ও পরিচর্যা করবেন 

গাজর বীজ অঙ্কুরোদগম হতে ৭-১০ দিন সময় লাগে। গাছের সঠিকভাবে যত্ন নিতে হবে। জমিতে আগাছা থাকলে পোকামাকড়, রোগ জীবাণু ও ইঁদুরের আক্রমণ বেশি হয়। তাই গাছের গোড়ায় যেন আগাছা না জন্মে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আগাছা জন্মালে তা নিড়ানী দিয়ে উপড়ে ফেলতে হবে। এবং নিয়মিত গাছের পরিচর্যা করতে হবে।

গাজরের খাদ্য গুণাগুণ 

গাজরে মধ্যে অনেক ধরণের খাদ্যগুন বিদ্যমান। গাজর  ক্যারোটিন, ভিটামিন ‘এ´, থায়ামিন ও রিবোফ্লোবিন সমৃদ্ধ সবজি। এর সবুজ পাতা ও পুষ্টিকর, প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ সমৃদ্ধ। এছাড়া এতে যথেষ্ট পরিমাণ ক্যালসিয়াম, লৌহ, ফসফরাস, কার্বহাইড্রেট বা শর্করা পাওয়া যায়।

গাজর চাষে কখন ফসল/সবজী  সংগ্রহ করবেন

বীজ বপনের ৩ মাসের মধ্যে গাজর সংগ্রহের উপযোগী হয়। পুষ্ট ও ভালোমানের গাজর পেতে হলে বীজ বোনার ১০০ থেকে ১২৫ দিনের মধ্যে ফসল সংগ্রহ করতে হবে।

অন্যান্য ব্যবহার  

রান্না করে, সালাদ তৈরি এবং কাঁচা অবস্থায় গাজর খাওয়া যায়। কালোরঙা গাজর দিয়ে এক রকম সুধাবর্ধক পানীয় তৈরি হয়। এছাড়া গাজর দিয়ে বিভিন্ন সুস্বাদু খাবার যেমন হালুয়া, পায়েস ইত্যাদি তৈরি করা যায়। গাজর ছোট বড় সবাই পছন্দ করে তাই এর চাহিদা প্রচুর।

সংকলনে- মোঃ শাহিন মিয়া