শিমের বিভিন্ন রোগবালাই, পোকামাকড় ও তাঁর ব্যবস্থাপনা

প্রকাশিত ২২ আগস্ট, ২০১৮ | আপডেট: ৬ জুলাই, ২০২০

শিম আমাদের দেশের একটি অতি পরিচিত সবজি। এটি সাধারনত শীতকালীন সবজী। শিম অনেক সুস্বাদু একটি সবজি। বর্তমানে শিম চাষে অনেক ধরনের রোগবালাইয়ের প্রভাব দেখা যায়। তাই শিম চাষের ক্ষেত্রে শিমের প্রকৃত রোগ সনাক্ত করে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। আসুন জেনে নেই শিমের কিছু রোগবালাই ও তাঁর প্রতিকার। 

রোগের প্রভাব ও লক্ষণ এবং পোকামাকড়ের আক্রমণের লক্ষনঃ

১। এনথ্রাকনোজ রোগঃ অ্যানথ্রকনোজ এক প্রকার ছত্রাক রোগ। সাধারণত শিম চাষে এ রোগের প্রাদুর্ভাব ব্যাপক হারে হয়ে থাকে। এ রোগের আক্রমণে শিমের পাতা ও ফলের গায়ে কিছু অসম আকৃতির গোল ভেজা দাগ পড়ে। তা কালচে রঙের হয় ও পাতার কিনার দিক ঝলসে যায়।

২। পাউডারি মিলডিউঃ পাউডার শিম চাষের ক্ষেত্রে একটি মারাত্মক রোগ। এ রোগে শিম চাষ আক্রান্ত হলে পুরনো পাতার ওপর গোলাকৃতি পাউডারের মতো দাগ পড়ে। ধীরে ধীরে তা সব পাতায় ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষপর্যন্ত পাতা ঝরে পড়ে।

৩। ঢলে পড়া রোগঃ ছত্রাকজনিত ঢলে পড়া রোগে গাছের পাতা-ডগা কুঁকড়ে যায়। গুঁটি বাড়ে না, গাছ ক্রমেই নিস্তেজ হয়ে ঢলে পড়ে।

৪। কুটেঃ বীজবাহিত ভাইরাস রোগ হলো কুটে। এটা শিমের মারাত্মক একটি রোগ। থ্রিপস বা জাবপোকা এ রোগ ছড়িয়ে থাকে।

৫। গাছেরগোড়া ও শিকড় পচা রোগঃ অনেক সময় গাছের গোড়া ও শিকড় পচা রোগ দেখা যায়৷

৬।  শিম পোকাঃ শিম পোকা অনেকটা গোবরের পোকার মতো দেখতে। এদের গায়ের রঙ তামাটে, শক্ত পাখার ওপরে ১৬টি কালো দাগ থাকে। পোকা ও শূককীট দুই-ই শিম গাছের প্রায় সর্বত্র আক্রমণ চালায় এবং গাছ খেয়ে নষ্ট করে দেয়।

৭।  জাবপোকা বা চোষি পোকাঃ জাবপোকা, থ্রিপস বা চোষি পোকা শিমের আরো দু´টি বড় শত্রু। শিমজাতীয় শস্যে তারা আক্রমণ চালায় এবং প্রচণ্ড ক্ষতি করে। ছোট ছোট সবুজ রঙের জাবপোকা দল বেঁধে গাছের ডগা, কাণ্ড, ফুল-ফল থেকে রস চুষে খায়। পাতা ক্রমে হলদে হয়ে যায়। পরে শুকিয়ে ঝরে পড়ে।

৮। ক্ষুদে মাকড়ঃ খালি চোখে এই পোকা দেখা যায়না৷ ক্ষুদে মাকড় পাতার নিচে বাস করে এবং সেখানে ডিম পাড়ে ও বংশ বিস্তার করে৷ এরা পাতা ও কচি ডগার রস শুষে খায়৷ ফলে পাতা ও কচি ডগা কুকড়ে যায় ও ফলন কম হয়৷

৯। মাজরা পোকাঃ মাজরা পোকার কীড়া সীমের ভিতরে ঢুকে বীজ ও সীম খেয়ে নষ্ট করে দেয়৷

রোগের প্রতিকার

১। এনথ্রাকনোজ রোগঃ অ্যানথ্রকনোজ রোগ মূলত বীজবাহিত রোগ। এ রোগের হাত থেকে শিম চাষকে বাঁচাতে হলে বীজ রোপণের আগে কার্বেন্ডাজিম ৫০ ডব্লিউপি, ডেলিজম, কারজিম, অগ্নি, সেনজিম, কবিস্টিন জেকে স্টিন প্রভৃতি ছত্রাকনাশকের মধ্যে যেকোনো একটি দিয়ে বীজ শোধন করতে হবে। এ ছত্রাকনাশকের মধ্যে যেকোনো একটি প্রতি এক কেজি বীজের জন্য তিন গ্রাম ব্যবহার করতে হবে। অথবা ক্যাপটান ৫০ ডব্ল্যুপি, ক্যাপটান, ক্যাপটাফ ডেল্টন ইত্যাদির মধ্যে যেকোনো একটি ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানি দুই গ্রাম হারে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

২। পাউডারি মিলডিউঃ  এ রোগের আক্রমণ থেকে শিম চাষ বাঁচাতে প্রতিকার স্বরূপ সালফার ৮০৬ ডব্ল্যুপি, সালফেকস, সালটাফ ইত্যাদির মধ্যে যেকোনো একটি প্রতি দুই লিটার পানি মিশিয়ে রোগের আক্রমণের প্রথম অবস্থায় সাত দিন পর পর দুইবার করে স্প্রে করে দিতে হবে।

৩। ঢলে পড়া রোগঃ এ রোগের কোনো প্রতিকার নেই। তবে এ রোগের আক্রমণ যাতে না হয় সে জন্য জমিতে বীজ রোপণের আগে বীজ শোধন করতে হবে। তা ছাড়া রোগ সহনশীল জাতের বীজ রোপণ করতে হবে।

৪। কুটেঃ শিম চাষে কুটে রোগের বাহক পোকা মারার জন্য মিথাইল ডিমিটন ২৫ ইসি, মেটামিসটনস, হাইমনস ইত্যাদির যেকোনো একটি প্রতি এক লিটার পানিতে ২ মিলিলিটার মিশিয়ে স্প্রে করে দিতে হবে।

৫। গাছেরগোড়া ও শিকড় পচা রোগঃ এর প্রতিকারের জন্য বীজ লাগানোর পূর্বে বীজ শোধণ করতে হবে৷ ১ কেজি বীজ ২.৫ গ্রাম ভিটাভেক্স ২০০ নামক কীটনাশক দ্বারা উত্তমরূপে মিশাতে হবে৷ তাছাড়া ক্ষেতে রোগ দেখা দিলে ডায়থেন ৪৫ গ্রাম ১০ কেজি পানির সংগে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে৷

৬। শিম পোকাঃ শিম চাষ থেকে এ পোকা দূর করতে ম্যালাথিয়ন ৫০ইসি সাইথিয়ন, স্টারম্যাল, এলথিন, ম্যালটক্স ইত্যাদির মধ্যে যেকোনো একটি প্রতি এক লিটার পানি দুই মিলিলিটার হারে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

৭। জাবপোকা বা চোষি পোকাঃ পোকা নিয়ন্ত্রণের জন্য অ্যান্ডো সালফার ৩৫ ইসি, যেমন-থায়োডান, থায়োনেল, থায়োফিল, অ্যান্ডোশেল, অ্যান্ডোস্টার, সেনফান ইত্যাদি কীটনাশকের মধ্যে যেকোনো একটি প্রতি এক লিটার পানিতে দুই মিলিলিটার কীটনাশক মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। এ ছাড়া ফসফাসিডন ৮৫ এসএল ডিমেক্রন, সুসিডন রিলন ইত্যাদির যেকোনো একটি কীটনাশক প্রতি এক লিটার পানি ০.৭৫ মিলিগ্রাম হারে মিশিয়ে আক্রান্ত গাছে স্প্রে করা যায়। 

৮। ক্ষুদে মাকড়ঃ ক্ষুদেমাকড় প্রতিকারের জন্য কেলথন ৪০ এম এফ ঔষধের ৩ চা চামচ অথবা থিওভিট কীটনাশকের ৩৫ গ্রাম ১০ সের পানির সঙ্গে মিশিয়ে উত্তররূপে পাতার নিচে অংশ ভিজিয়ে দিতে হবে৷ এই পরিমাণ কীটনাশক ৫ শতক জমিতে দেয়া যায়৷ ক্ষেতে রাসয়নিক কীটনাশক দেবার অন্তত: সাত দিন পর্যন্ত ঐ ক্ষেতের শিম বিক্রি বা খাওয়া যাবে না৷

৯। মাজরা পোকাঃ মাজরা পোকা প্রতিকারের জন্য রিপকর্ড-১০ ইসি কীটনাশকটির ১০ মি. লি. বা ২ চা চামচ ১০ সের পানির সঙ্গে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে৷ এইপরিমাণ ৫ শতক জমিতে দেওয়া যাইবে৷ ক্ষেতে রাসায়নিক ঔষধ দেবার অন্তত সাত দিন পর্যন্ত ঐ ক্ষেতের শিম বিক্রি বা খাওয়া যাবে না৷ 

দমন পদ্ধতি / কীটনাশক

শিম চাষে যদি কোন প্রকার আক্রমণ দেখা দেয় তবে অবশ্যই যততাড়াতাড়ি সম্ভব রোগ সনাক্ত করে উপরোক্ত ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। তা না হলে অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে।

সংকলনে- মোঃ শাহিন মিয়া