গুড় উৎপাদন পক্রিয়া

প্রকাশিত ১১ মার্চ, ২০১৮ | আপডেট: ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২০

আবহমান বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্য গুড় এখনও এদেশের মানুষের কাছে যথেষ্ঠ জনপ্রিয়। আখ, তাল অথবা খেজুরের রস থেকে উৎপাদিত ঘণীভূত তরল কিংবা কঠিন পদার্থই গুড়। পিঠা-পুলি অথবা মিঠাই-মন্ডা তৈরিতে গুড়ের ব্যবহার এখনও উল্লেখযোগ্য। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদিত গুড়ের মান, আকার, ফলন এবং উৎপাদন প্রণলী বিভিন্ন রকম।

গুড় উৎপাদনের ক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয় ধাপগুলি নিম্নরূপ

ক) রস নিষ্কাশন।

খ) রস পরিষ্কারকরণ।

গ) রস ঘণীভূতকরণ।

আখ, খেজুর, তাল ও গোলপাতা থেকে গুড় তৈরি করা যায়। আখের গুড় সারাদেশেই জনপ্রিয়। 

গুড়ের জন্য রস নিষ্কাশন

ক) সাধারনত- গরু অথবা মহিষ দিয়ে তিন রোলার বিশিষ্ট মাড়াই যন্ত্রে পিষে আখ থেকে রস বের করা হয়। 

খ) ডিজেল/ পেট্রল/ বিদ্যুৎ চালিত মাড়াই যন্ত্রের মাধ্যেমেও অনেকে আখের রস বের করে থাকেন।

গ) তবে এই পদ্ধতিতে আখ থেকে ৪৫-৫৫% আখের রস সংগ্রহ করা যায়। সম্প্রতি বিএসআরআই পাঁচ রোলার বিশিষ্ট একটি উন্নত আখ মাড়াই যন্ত্র আবিষ্কার করেছে।

ঘ) এই যন্ত্রটি ব্যবহার করলে ৬১% এর বেশি আখের রস পাওয়া যায়। এই যন্ত্রটি ব্যবহার করে একজন গুড় উৎপাদনকারী একই পরিমাণ আখ থেকে অধিক লাভবান হতে পারেন।

ঙ) খেজুর গাছের রসের পরিমাণ নির্ভর করে কাটা অংশের আয়তনের উপর। তবে খুব বেশি দীর্ঘ করে কাটলে গাছ দূর্বল হয়ে পড়ে। 

চ) তাল ও গোল পাতার রস আহরণ পদ্ধতি ভিন্ন রকমের। এই দুটি গাছেরই পুস্পমঞ্জরী থেকে রস আহরন করা যায়।

ছ) সঠিক সময়ে এবং সঠিক উপায়ে রস আহরণ করা না হলে এসব গাছ থেকেও রস আহরণের পরিমাণ কমে যায়।

গুড়ের জন্য রস পরিস্কারকরণ

ক) রস পরিষ্কারকরণের উদ্দেশ্য হল রসের মধ্যে থাকা সকল অনাকাঙ্খিত ও অপদ্রব্য বের করে দেওয়া। 

খ) রস পরিস্কারকরনের ফলে রসের রঙ উজ্জ্বল হয় এবং গুড়ের মান ও বাজার মূল্য বৃদ্ধি পায়।

গ) জৈব ও অজৈব বিভিন্ন ধরণের পরিষ্কারক দ্বারা রস পরিষ্কার করা হয়। 

গুড়ের জন্য উদ্ভিজ্জ পরিস্কারকের পরিমাণ

ক) প্রতি কড়াই (২০০-২২০ লিটার) রসের জন্য ২ কেজি ঘৃত কুমারীর প্রয়োজন হয়। 

খ) ঘৃত কুমারীর নির্জাস ফুটন্ত রসের মধ্যে মিশিয়ে দিলে রসের মধ্যে থাকা অপদ্রব্যসমূহ একত্রে জড়ো হয়ে রসের উপরে ভেসে ওঠে। 

গ) এরপর তা সহজেই ছাঁকনি দিয়ে তুলে ফেলা যায়।

গুড়ের রাসায়নিক পরিস্কারকের পরিমাণ

ক) রাসায়নিক পরিষ্কারক বিশেষত হাইড্রোজ ব্যবহার সাধারণভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়। 

খ) তারপরও কেউ এ দ্রব্য ব্যবহার করতে আগ্রহী হলে তা ফুটন্ত রসের মধ্যে এবং খুব কম পরিমাণে (সর্বোচ্চ ৫০ গ্রাম/ ২০০-২২০ লিটার রস) ব্যবহার করতে হবে।

গুড়ের জন্য রস ঘনীভূতকরণ

ক) রস ঘনীভূতকরণ একটি বিশেষ প্রক্রিয়া। রস পরিষ্কার করার পর কড়া জ্বালে (১১০-১১৫০ সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায়) ফুটিয়ে তা থেকে অধিকাংশ জলীয় পদার্থ বাস্পোভূত করে দেয়া হয়। 

খ) এভাবে ফুটন্ত রস ঘন সিরাপে পরিণত হয়। রস জ্বাল থেকে নামানোর উপযোগী হয়েছে কিনা তা বোঝার জন্য কয়েক ফোঁটা সিরাপ বা রস পরিষ্কার ঠাণ্ডা পানিতে ফেলে দেখতে হবে যে তা জমাট বাঁধে কি না। 

গ) যদি তা জমাট বাঁধে এবং পানিত ছড়িয়ে না যায় তবে বুঝতে হবে যে রস জ্বাল থেকে নামানোর সময় হয়েছে। এ অবস্থায় কড়াই ভর্তি রস জ্বাল থেকে নামিয়ে কাঠের হাতলের সাহায্যে কিছুটা ঠাণ্ডা করতে হবে।

ঘ)  এরপর চাহিদামত কাঠের বা মাটির ছাঁচে উক্ত সিরাপ বা রস ঢালতে হবে। এ অবস্থায় কিছুক্ষণ রেখে দিলেই ঐ রস ঠাণ্ডা হয়ে জমাট বেঁধে যাবে এবং তা গুড় হিসেবে বিক্রি অথবা সংরক্ষণ করা যাবে। 

গুড়ের মাননিয়ন্ত্রন

গুড়ের মান নিয়ন্ত্রন নির্ভর করে নিম্নলিখিত বিভিন্ন বিষয়ের উপর

ক) উপযুক্ত আখের জাত নির্বাচন।

খ) পরিমাণমত সার ব্যবহার ও ফসলের প্রয়োজনীয় পরিচর্যা।

গ) রসের মধ্যে থাকা অচিনিজাত দ্রব্যাদি। 

সংকলনে- মোঃ শাহিন মিয়া