গর্ভাবস্থায় মহিলাদের কমন সমস্যা, জীবাণু সৃষ্ট সংক্রমণ ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও ব্যবস্থা গ্রহণ

প্রকাশিত ১০ মার্চ, ২০১৮ | আপডেট: ১২ আগস্ট, ২০২০
শারীরিক সমস্যা যে কারো যে কোন সময়ই দেখা দিতে পারে। তবে গর্ভবতীকালীন কিছু সমস্যা সচারাচর প্রায় দেখা যায়। মহিলারা কমন কিছু সমস্যায় বেশি ভোগে থাকেন। সমস্যাগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে প্রিইক্লাম্পসিয়া। শব্দটি বেশির ভাগ মহিলারাই শুনে থাকতে পারেন। গর্ভাবস্থার প্রায় ২০তম সপ্তাহের পর রক্তচাপ বেড়ে গেলে এবং মূত্রে প্রোটিনের উপস্থিতি ঘটলে প্রিইক্লাম্পসিয়া লক্ষ্য করা যায়। 
এটি চেনার উপায় হচ্ছে ফ্লুইড বা তরল পদার্থ দ্বারা পা, গোড়ালি, মুখমন্ডল ও হাত ফুলে যাওয়া; দৃষ্টি সমস্যায় ভোগা, পাজরের ঠিক নিচে ব্যথা ও মাথাব্যথা। ঠিক কি কারণে এটি হয়ে থাকে তা এখনো অজানা। কিছু সম্ভাব্য কারনসমূহের মধ্যে রয়েছে রক্তবাহী ধমনী বা শিরার সমস্যা, অটোইমিউন জনিত রোগ, জীনগত সমস্যা, ৩৫ এর চেয়ে অধিক বয়স, ডায়াবেটিস বা কিডনি রোগ বা উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদি।
এসমস্ত বিষয়ে সদা সজাগ থাকুন ও প্রিইক্লাম্পসিয়ার লক্ষণাদি দেখা দিলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।
গর্ভাবস্থায় মহিলাদের মধ্যে আরেকটি সমস্যা দেখা যেতে পারে তা হল জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস। গর্ভবতী মহিলাদের ১-৩% এ প্রকারের ডায়াবেটিসে ভোগে। গর্ভাবস্থার ১৪-২৬তম সপ্তাহে এটি দেখা দেয়ার সম্ভাবনা থাকে। জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস গর্ভবতী মহিলা ও শিশুর জন্য হুমকিসরুপ। রক্তে গ্লুকোজের অধিক মাত্রা গর্ভবতী মহিলা ও তার শিশু উভয়ের জন্যই অস্বাস্থ্যকর হতে পারে। এ সময় যদি ডায়াবেটিসের চিকিৎসা করা না হয়, জন্মের সময় শিশুর সমস্যা থাকার অধিক সম্ভাবনা থাকে। 
জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস খাবার এবং ব্যায়ামের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রন করা যায়। কিছু কিছু মহিলার ব্লাড সুগার লেভেল নিয়ন্ত্রনে রাখার জন্য ওষধের প্রয়োজন হতে পারে।
আরো কিছু সমস্যা কম বেশ সবার মধ্যেই কমন সেগুলো হল যৌনবাহিত সংক্রমন বা রোগ। যৌনবাহিত সংক্রমনের মধ্যে রয়েছে সিপিলিস ও ক্ল্যামাইডিয়া। এ সমস্যাগুলো যৌন সম্পর্কের সময়ে অর্থাৎ যৌন সংস্পর্শে্র মাধ্যমে একজন থেকে অপরজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস হচ্ছে স্বাভাবিকভাবে যৌনিতে উপস্থিত ব্যাকটেরিয়ার অধিক বৃদ্ধি দ্বারা সৃষ্ট এক ধরনের যোনি সংক্রমন। প্রজননকালে মহিলাদের এই ধরণের সংক্রমণে পড়ার সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা থাকে। ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস একটি কমন সমস্যা যা সব বয়সী মেয়ে ও নারীদের আক্রমণ করতে পারে। কারণ পুরোপুরি বোঝা না গেলেও অরক্ষিত যৌনসহবাস সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।
ক্ল্যামাইডিয়া একটি যৌন বাহিত সংক্রমন। যৌন সহবাসের সময়ে ক্ল্যামাইডিয়া একজন থেকে অপরজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। মুত্র ত্যাগে জ্বালাপোড়া, মহিলাদের স্রাব, পুরুষদের লিঙ্গ থেকে তরল নিঃসরণ,  পেটের নিচের অংশে ব্যথা, যৌনসহবাসের সময় মহিলাদের ব্যথা অনুভব, সংসর্গের পরে যোনি দিয়ে রক্তপাত, পিরিয়ডের মধ্যে রক্তক্ষরণ ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়। লক্ষণাদি দেখা দেয়ার সাথে সাথে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।
সিপিলিস যৌন সংস্পর্শে্র মাধ্যমে ছড়ানো একটা ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমন। এই রোগ ব্যথাহীন ক্ষত হিসেবে শুরু হয়ে থাকে। এই ক্ষত দ্বারা ত্বক বা মিউকাস মেমব্রেনের সংস্পর্শের মাধ্যমে সিফিলিস এক ব্যক্তি থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এটি ট্রেপোনেমা প্যালিডাম (Treponemapallidum) নামক স্পিরোকীট ব্যাকটেরিয়া দিয়ে গঠিত। প্রাইমারী লক্ষণ হচ্ছে জনন অঙ্গে, মলাশয়ে বা মুখে ছোট ও ব্যথাহীন ক্ষত, ক্ষত অঞ্চলের লিম্ফ নোড বড় হয়ে যাওয়া। চিকিৎসা না করলে এটি ভীষণভাবে হার্ট, ব্রেইন বা দেহের অন্যান্য অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে ও জীবনের জন্য আশঙ্কাজনক হতে পারে। সংক্রমণ মা থেকে গর্ভস্থ শিশু (এখনো জন্মায়নি) পর্যন্ত অতিবাহিত হতে পারে।
ক্যানডিডার সংক্রমন অন্যান্য সংক্রমণের চেয়ে বেশি লক্ষণীয়। লক্ষণসমূহ হচ্ছে জনন অঙ্গে ছোট ছোট র‍্যাশ যা তীব্র চুলকানি সৃষ্টি করে। এটি ঘটে থাকে ক্যান্ডিডা ফাঙ্গাস (যেমন Candida albicans) দিয়ে। দেহের বিভিন্ন স্থানে ক্যানডিডার সংক্রমন হতে পারে। গর্ভাবস্থার সময় কিছু সংখ্যক মহিলাদের মধ্যে এটি সচারাচর সমস্যা।
হার্পিস এর মধ্যে জেনিটাল হার্পিস গর্ভাবস্থায় দেখা যেতে পারে এবং তা গর্ভাবস্থার সময় সমস্যা তৈরী করতে পারে। এটি herpes simplex virus দিয়ে গঠিত একটি সচারাচর সেক্সুয়ালী ট্র্যান্সমিটেড ইনফেকশন। 
ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার প্রাথমিক উপায় হচ্ছে যৌন সংস্পর্শ। জেনিটাল হার্পিস আছে কিনা তার উপর নির্ভর করে জটিলতা আরো খারাপের দিকে যেতে পারে। জেনিটাল হার্পিসের কোন নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই, কিন্তু মেডিকেশন লক্ষণাদি লাঘব করতে পারে ও অন্য স্থানে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি কমায়। কনডম জেনিটাল হার্পিস ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সাহায্য করতে পারে।
উপরিউক্ত সমস্যাগুলো দেখা দেয়ার সাথে সাথে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত। তা না হলে মা ও গর্ভস্থ সন্তান উভয় জটিল সমস্যার মুখোমুখি হবে। যে রোগগুলো যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে হয়ে থাকে সে ক্ষেত্রে যৌন সম্পর্ক থেকে বিরত থাকাই উত্তম।

গর্ভাবস্থায় কিছু স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও ব্যবস্থা গ্রহণ

শারীরিক অসুস্থতা দেখা দিতেই পারে, এতে বিচলিত হওয়া বা ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই। মানবদেহে যেমন রোগ রয়েছে তেমনি রয়েছে উক্ত রোগের চিকিৎসা। যথাসময়ে রোগের চিকিৎসা গ্রহণ একজন রোগীকে দ্রুত সারিয়ে তোলতে পারে। কিন্তু গর্ভাবস্থার সময়ে মহিলাদের অসুস্থতা গর্ভস্থ শিশুর উপর প্রভাব ফেলতে পারে। 
সেই জন্যে বিশেষ সতর্কতা এই সময়ে গ্রহণ করতে হয়। 
গর্ভধারণের আগে শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতির বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। প্রাপ্ত বয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত ও শারীরিক সমস্যা সমাধান না করা পর্যন্ত গর্ভধারণ করা একজন মহিলার উচিত নয়। এতে মা ও শিশু উভয় গুরুতর অবস্থার সম্মুখীন হতে পারে। প্রথমত গর্ভকালীন সময়ে কিছু জটিলতার কথা না বললেই নয়।
১। গর্ভাবস্থায় নিম্নোক্ত সমস্যাগুলো যদি দেখতে পান তবে বিলম্ব না করে আপনার চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াটা অত্যন্ত জরুরী।
২। খিঁচুনি একটা কমন সমস্যা যা গর্ভাবস্থায় প্রায় অধিকাংশ মহিলাদের মধ্যে দেখা যায়।
৩। অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা, মহিলাদের বেশি ভোগতে দেখা যায়। সেই কারণে মহিলাদের বাড়তি আয়রনযুক্ত খাবার ও সাপ্লিমেন্টের প্রয়োজন পড়ে।
৪। পা ফুলা বা অনেকের মতে পায়ে পানি আসা মহিলাদের মধ্যে দেখতে পাওয়া একটা সাধারণ সমস্যা।
৫। প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া বিভিন্ন জীবাণুর আক্রমন বা সংক্রমণের কারণে ঘটে থাকে।
আরো রয়েছে অতিরিক্ত বমি, পেট ব্যথা,  জন্ডিস, উচ্চ রক্তচাপ, দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব, যোনিপথ দিয়ে রক্তপাত বা রক্তস্রাব ইত্যাদি। এই ধরণের সমস্যার জন্যে মেডিক্যাল ট্রিটমেন্টের দরকার পড়ে। তাই সমস্যাগুলো দেখা দিলে আপনার চিকিৎসককে জানান।

গর্ভবতী মহিলাদের অনিয়ন্ত্রিত অ্যাজমার ঝুঁকি

পূর্বে যদি আপনার অ্যাজমা না থেকে থাকে, আপনি ভাবতে পারেন না যে গর্ভাবস্থায় সাঁসাঁ করে নিঃশ্বাস ফেলাই হচ্ছে অ্যাজমা। আবার যদি জানেন আপনার অ্যাজমা আছে, তবে আপনি এটাকে উদ্বেগ বা মাথাব্যথা নাও মনে করতে পারেন যদি আপনার কেবল হালকা উপসর্গ বা লক্ষণ থেকে থাকে।
অ্যাজমা যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিম্নোক্ত অবস্থা ধারণ করে-
১। গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ।
২। প্রি-ইকলাম্পসিয়া।
এই লেখাটি শুধুমাত্র তথ্যের জন্য, কিন্তু চিকিৎসা সংক্রান্ত অবস্থা নিরুপন বা চিকিৎসা গ্রহণের জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়।

লেখক- মোঃ ফারুক হোসাইন