স্তনের সাধারণ সমস্যা

প্রকাশিত ৩০ জুন, ২০১৮ | আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০

১। শিশুদের জন্মের পরে দেখা যায় তাদের স্তন থেকে সাদা জলীয় পদার্থ বা দুধের মত পদার্থ বের হয়। এটি দেখে ভয় পাবার কিছু নেই। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এরজন্য আলাদা করে চিকিৎসার প্রয়োজন নেই। মায়ের ডিম্বাশয় ও অমরা (Placenta) থেকে নিঃসৃত হরমোনের প্রভাবে এটি হতে পারে যা কিছুদিন পর এমনিই স্বাভাবিক হয়ে যায়।

২। গর্ভাবস্থায় বা স্তন্যদানের সময় স্তন ব্যথা বা স্তন ভারী মনে হতে পারে। আসলে গর্ভাবস্থায় এবং গর্ভপরবর্তী সময়ে স্তনে রক্তপ্রবাহ অনেক বেড়ে যায় এবং দুধ উৎপাদন হতে থাকায় স্তন ভারী লাগা বা সামান্য ব্যথা অনুভূত হতে পারে।

৩। স্তনে প্রদাহ সাধারণত মায়েদের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণের ফলে স্তন লাল হয়ে ব্যাথা অনুভূত হয়। এছাড়াও স্তনে ফোঁড়া স্তন ফুলে যায় এবং লাল হয়ে ব্যথা হয়ে থাকে। এরসঙ্গে জ্বর ও হতে পারে।

স্তনের টিউমার

 স্তনের টিউমার দুই প্রকার হতে পারে। যথা-

১। বিনাইন টিউমার (Benign Tumor)

২। স্তন ক্যান্সার (Breast Cancer)

স্তনের বিনাইন টিউমার নিরাপদ এবং শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে সম্পুর্ণ উপশম করা যায়। এটি ক্যান্সারের মত মারাত্মক নয়। এটি আশেপাশের কলা/টিস্যুতে ছড়ায় না এবং দূরবর্তী কোন স্থানকে আক্রান্ত করে না। স্তনের সবচেয়ে বেশি যে বিনাইন টিউমার দেখা যায় তা হল ফাইব্রোএডিনোমা (Fibroadenoma)

স্তন ক্যান্সার দূরারোগ্য ব্যাধি। প্রাথমিক অবস্থায় নির্ণয় না করা হলে এটি দেহের বিভিন্ন স্থানে, যেমন- ফুসফুস, যকৃত, অস্থি, ইত্যাদিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। 

স্তন ক্যান্সারের কারণসমূহ

ক) জিনগত বা পারিবারিক ইতিহাস।

খ) যে সব পরিবারে মা/ খালা/ অন্যান্য রক্তসম্বন্ধীয় আত্মীয়দের স্তন ক্যান্সার থাকে তাদের পরবর্তী প্রজন্মে স্তন ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বেশি।

গ) যাদের এক স্তনে ক্যান্সার হয়েছে তাদের অন্য স্তনেও ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

ঘ) বেশি বয়সে প্রথম সন্তান জন্মদাত্রীদের স্তন ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বেশি বিশেষত যারা ৩৫ বছরের পর প্রথম সন্তান গ্রহণ করেন।

ঙ) স্তন্যপান না করালে স্তন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

চ) ক্ষতিকর রশ্মি (Radiation) যেমন- গামা রশ্মি, এক্স রশ্মি ইত্যাদি স্তন ক্যান্সার তৈরি করতে পারে।

ছ) তাছাড়া আরও অনেক কারণেই স্তন ক্যান্সার হতে পারে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কারণ অজানা থাকে।

জ) সাধারণত স্তন ক্যান্সার, কোলন ক্যান্সার, জরায়ু ক্যান্সার এই তিনটি ক্যান্সার পারিবারিক ইতিহাস বা জিনগত বৈশিষ্ট্যর সাথে সম্পর্কযুক্ত।

ঝ) বয়স বাড়ার সাথে সাথে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে থাকে।

ঞ) আদ্যঋতুকালীন বয়স-

যেসব কিশোরীর আদ্যঋতু (Menarche) ১১ বছরের কম বয়সে হয় অর্থাৎ, ১১ বছরের পূর্বেই যাদের ঋতুস্রাব হয় ঝুঁকি বেশি।

ট) শ্বেত (White) নারীদের থেকে আফ্রো-আমেরিকান নারীদের স্তন ক্যন্সারের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি।

ঠ) ভৌগলিক দিক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে স্তন ক্যান্সারের ঘটনা অন্যান্য দেশের থেকে ৪-৭ গুণ বেশি।

ড) খাদ্যাভ্যাস-

১) ক্যাফেইন স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।

২) অ্যালকোহল ঝুঁকি বাড়ায়।

ঢ) শারীরিক স্থুলতা-

১) স্থুল নারীদের মেনোপজের পরবর্তী সময়ে স্তন ক্যান্সারের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। কারণ মেদকলা থেকে অরিরিক্ত ইস্ট্রোজেন হরমোনের আধিক্য স্তন ক্যান্সারের নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।

ণ) কায়িক শ্রম স্তন ক্যান্সার থেকে সুরক্ষা প্রদান করে।

ত) বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান, যেমন- কীটনাশক স্তন ক্যান্সারের প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।

স্তন ক্যান্সার অন্যান্য সকল ক্যান্সারের মতো প্রতিকারের থেকে প্রতিরোধই শ্রেয়। অনেক নারীই অশিক্ষা, কুসংস্কার, ভীতি, লজ্জা, অপবাদ, অভিশাপসহ আরও অনেক কারনে তাদের শরীরের বিভিন্ন রোগের কথা কারও কাছে বলতে পারেন না। যারফলে দেখা যায় পরবর্তীতে উক্ত রোগ ভয়াবহ রূপে দেখা দিতে পারে। স্তনের ক্ষেত্রে সেটা পরবর্তীতে ক্যান্সারের রূপ নিতে পারে। এজন্য এসকল বিষয়ে সকলকে সতর্ক হতে হবে।

স্তন ক্যান্সার রোধে যে সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় তা নিম্নে আলোচনা করা হল

ক) স্তনে কোন চাকা অনুভূত হলে তা যতই ছোট হোক অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিৎ। প্রতিমাসে অন্তত একবার গোসলের সময় দুই স্তনই হাত দিয়ে পরীক্ষা করে দেখা উচিৎ যে কোন চাকা অনুভূত হয় কিনা, স্তনে কোন পরিবর্তন দেখা যায় কি না, স্তনবৃন্ত বা অ্যারিওলাতে কোন পরিবর্তন দেখা যায় কি না, স্তনবৃন্ত থেকে রক্ত/ জলীয় পদার্থ ক্ষরণ হচ্ছে কিনা ইত্যাদি। বস্তুত, এগুলোই স্তন ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ।

খ) বগলে কোন চাকা অনুভূত হলে/ দেখা গেলে তাও চিকিৎসা করানো আবশ্যক। কেননা এটিও স্তন ক্যান্সারের খুব গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গ।

গ) যাদের পারিবারিক স্তন ক্যান্সারের ইতিহাস আছে তাদের প্রতি বছর বা অন্তত ৩ বছর পরপর ম্যামোগ্রাফি (Memography) করানো উচিৎ।

ঘ) যে সব কারণে স্তন ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি থাকে তা এড়িয়ে চলা উচিৎ। যেমন- রেডিয়েশন ইত্যাদি।

ঙ) জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি বিশেষ করে ইস্ট্রোজেন এর সমগোত্রীয় উপাদানসমৃদ্ধ বড়ি যথাসম্ভব পরিহার করা উচিৎ।

চ) সন্তান প্রসবের পর থেকে ২ বছর পর্যন্ত শিশুকে স্তন্যপান করানো উচিৎ। এতে যেমন শিশু প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান থেকে বঞ্চিত হয় না তেমনি অন্যদিকে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিও হ্রাস পায়।

ছ) স্তন ক্যান্সার নারী পুরুষ উভয়েরই হতে পারে। ৯৯% স্তন ক্যান্সার নারীদের হয়ে থাকে আর ১% ক্ষেত্রে পুরুষদের স্তন ক্যান্সার হতে পারে। তবে নারীদের থেকে পুরুষদের স্তন ক্যান্সারে আরোগ্য লাভের সম্ভাবনা তুলনামূলক কম।