আলুর রোগ ও পোকামাকড় দমন পদ্ধতি

প্রকাশিত ১ এপ্রিল, ২০১৮ | আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০

আমাদের দেশে খাদ্য হিসাবে আলুর চাহিদা ব্যাপক। আলুতে ভিটামিন সি ও বি পাওয়া যায়। কিন্তু সঠিক চাষাবাদের অভাব, আলু উৎপাদন করে ন্যায্য মূল্য না পাওয়া ইত্যাদি কারণে চাহিদার তুলনায় আলুর উৎপাদন খুবই কম।

ষাটের দশক থেকে এ দেশে উচ্চ ফলনশীল জাতের আলু চাষ হয়ে আসছে। এ পর্যন্ত দেশে আলুর ৩২টি উচ্চ ফলনশীল জাত অনুমোদন লাভ করেছে। এসব জাতের মধ্যে হীরা, আইসলা, পেট্রোনিস, মুলটা, ডায়ামন্ড, কার্ডিনাল, কুফরিসিন্দুরী, চমক, ধীরা, গ্রানোলা, ক্লিওপ্যাট্রা, বিনেলা, লেডিরোসেটা, কারেজ, মেরিডিয়ান, সাগিটা ও কুইন্সি ইত্যাদিই প্রধান। তবে সারা দেশে উচ্চ ফলনশীল জাতের মধ্যে ডায়ামন্ড, গ্রানোলা, কার্ডিনাল, পেট্রোনিস ও লেডিরোসেটা জাতের আলু বেশি পরিমাণে চাষ হচ্ছে। এ ছাড়া দেশি জাতের মধ্যে লাল পাকড়ি, শিলবিলাতি, কুফরিসিন্দুরী, লাল শিল ও চল্লিশা জাতের আলুও চাষ হচ্ছে বিভিন্ন এলাকায়। আলুতে বিভিন্ন ধরনের রোগ ও পোকা মাকড়ের আক্রমন দেখা দেয়। নিম্নে আলুর রোগ ও পোকা দমন পদ্ধতি দেওয়া হল:

আলুর নাবী ধ্বসা রোগ

এ রোগের লক্ষণসমূহ:

১. আলুর নাবী ধ্বসা রোগের আক্রমণে পাতায় ছোপ ছোপ ভিজা বাদামী অথবা ফ্যাকাশে, গোলাকার বা এলোমেলো দাগ দেখা যায় এবং পরে কালো বর্ণ ধারণ করে।

২. পরবর্তীতে দাগগুলো পাতার কিনারা হতে ভেতরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

৩. পাতার নীচের দিকে সাদা সাদা অসংখ্য পাউডারের মত ছত্রাক দেখা যায়।

৪. মারাত্মকভাবে আক্রান্ত গাছে পুরো পাতা ও কান্ড পঁচে যায় এবং দ্রুত সমস্ত গাছ মারা যায়।

৫. অনুকূল আবহাওয়ায় আলুর নাবী ধ্বসা রোগ খুব দ্রুত বিস্তার লাভ করে এবং আলু ফসলের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে।

দমন পদ্ধতি

১. নাবী ধ্বসা রোগ আক্রান্ত জমিতে সেচ দেওয়া বন্ধ করতে হবে।

২. আক্রান্ত গাছ দেখা মাত্র তুলে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।

কাণ্ডপচা রোগ

এ রোগের লক্ষণসমূহ:

১. এ রোগের আক্রমনে আলু গাছের কান্ড বাদামী রংয়ের দাগ দ্বারা আবৃত হয়ে পড়ে এবং গাছ ঢলে পড়ে ও নীচের পাতা হলুদ হয়ে যায়।

২. মারাত্মকভাবে আক্রান্ত আলু থেকে পানি বের হয় এবং পচন ধরে।

৩. আক্রান্ত গাছের কান্ডে বা আশেপাশের মাটিতে সাদা সাদা ছত্রাকের জালিকা দেখা যায় যা পরবর্তীতে স্কেলেরোশিয়া গঠন করে।

দমন পদ্ধতি 

১. আক্রান্ত গাছ মাটি সহ তুলে পুড়িয়ে ফেলতে হবে বা পুঁতে ফেলতে হবে ।

২. বীজ বপনের পূর্বে জমিতে প্রচুর পরিমাণে পচা জৈব সার প্রয়োগ করতে হবে এবং আলু বীজ ২ গ্রাম ম্যানকোজেব ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে শোধন করতে হবে।

আলুর কাটু পোকা

১. আলু লাগানোর ২০-২৫ দিন পর চারা অবস্থা থেকেই কাটু পোকা আক্রমন করে।

২. দিনের বেলায় এ পোকা মাটির নীচে বা আর্বজনার ভিতরে লুকিয়ে থাকে এবং রাতে চারা গাছের কান্ড মাটি বরাবর কেটে দেয় ও পাতা খেয়ে ফেলে।

৩. এছাড়া বীজ বপনের ৪০-৪৫ দিন পর আলু গজানোর পরও কাটুই পোকা আলুর ক্ষতি করতে পারে এমন কি আলু তোলার আগ পর্যন্ত এ পোকার আক্রমণ হতে পারে।

৪. অনেক সময় কাটুই পোকা পুরো গাছ না কেটে আংশিকভাবে কাটার ফলে আলু গাছ নিস্তেজ হয়ে ঢলে পড়ে এবং মারা যায়।

৫. মাটির নীচে আলু বড় হলে কাটুই পোকা ছিদ্র করে খায় এবং ছিদ্রের মাধ্যমে পানি প্রবেশ করায় আলু পঁচে যায়।

দমন পদ্ধতি

১. প্রতিদিন সকালে আলু ক্ষেত পরিদর্শন করে কাটা চারার চারপাশের মাটি থেকে কীড়া সংগ্রহ করে মেরে ফেলতে হবে।

২. আক্রান্ত জমিতে ডাল পুঁতে সেচ বিশেষ করে কেরোসিন যুক্ত পানি দিয়ে সেচ দিলে কাটুই পোকার কীড়া উপরে উঠে আসে, ফলে পাখিরা সহজেই খেয়ে ফেলতে পারে।

৩. বিকেল বেলা আক্রান্ত ক্ষেতে ঘাস, শুকনা আগাছা, খড়কুটো ইত্যাদি জড়ো করে রাখলে তার নীচে কাটুই পোকা আশ্রয় গ্রহণ করে। সকাল বেলায় গাদার নীচ থেকে কাটুই পোকা সংগ্রহ করে মেরে ফেলতে হবে।

জাব পোকা

১. জাব পোকা পূর্ন বয়স্ক ও বাচ্চা উভয়ই অবস্থাতেই আলু গাছের ক্ষতি করতে পারে।

২. জাব পোকা আক্রান্ত গাছের পাতা, কান্ড ও ডগা থেকে রস চুষে খায় এবং বিভিন্ন ভাইরাস জনিত রোগের বাহক হিসেবে কাজ করে।

৩. মারাত্মকভাবে আক্রান্ত গাছের পাতা কুকড়ে যায় এবং হলুদ বর্ণ ধারন করে অথবা পাতা বিভিন্ন আকৃতি ও বর্ণের হতে পারে।

৪. মেঘলা ও কুয়াশাছন্ন আবহাওয়ায় জাব পোকার বংশ দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

দমন পদ্ধতি

১. আলু ক্ষেতের আশেপাশে সোলানেসী  গোত্রভূক্ত ফসল যেমন টমেটো, বেগুন, মরিচ ইত্যাদি চাষ করা যাবে না এবং সুষম সার ও সময়মত সেচ দিতে হবে।

২. জাব পোকার প্রাকৃতিক শত্রু যেমনঃ লেডিবার্ড বিটল, বোলতা ইত্যাদি সংরক্ষণ করে আক্রমণের ব্যাপকতা কমানো যায়।

৩. পরিপক্ক গাছে অর্থাৎ আলু উত্তোলনের অল্প আগে পোকার আক্রমণ হলে আক্রান্ত গাছ উপড়ে ফেলতে হবে।

৪. প্রতি লিটার পানিতে ১.৫ মিলি হারে ইমিডাক্লোরোপিড অথবা ২ মিলি হারে ডায়মেথয়েট ভালভাবে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।