আদার চাষ পদ্ধতি

প্রকাশিত ১ এপ্রিল, ২০১৮ | আপডেট: ২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

আদা একটি মূল্যবান ও জনপ্রিয় মশলাজাতীয় ফসল। আমাদের দেশে আদার উৎপাদন চাহিদার তুলনায় খুবই কম। চাহিদা পূরণের জন্য প্রতি বছর বিদেশ থেকে প্রচুর আদা আমদানি করতে হয়। ভেষজ গুণ থাকায় আদা কাঁচা ও শুকনা দুভাবেই ব্যবহার করা যায়। উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে আদার ফলন এবং উৎপাদন বাড়িয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে আদা রপ্তানি করা সম্ভব। আসুন জেনে নেই আদা চাষ করার পদ্ধতি।

আদার পুষ্টিগুণ

আদা উৎকৃষ্ট ভেষজ গুণসম্পন্ন মসলা জাতীয় ফসল, এতে উল্লেখযোগ্য পুষ্টিগুণ বিদ্যমান। শুকনা আদায় শতকরা ৫০ ভাগ শর্করা, ৮.৬ ভাগ আমিষ, ৫.৯ ভাগ আঁশ, ০.১ ভাগ ক্যালসিয়াম, ১.৪ ভাগ পটাশিয়াম আছে। এছাড়া প্রতি ১০০ গ্রাম আদায় ১৭৫ গ্রাম ভিটামিন ‘এ´ এবং ৩৮০ ক্যালরি খাদ্যশক্তি আছে।

আদার ভেষজ গুণ

আদা শরীরের জন্য খুবই উপকারি।আদা দেহের অতিরিক্ত ওজন কমাতে সাহায্য করে। আদার রস খেলে আহারের রুচি আসে এবং ক্ষুধা বাড়ে। আদার রস মধু মিশিয়ে খেলে কাশি দূর হয়। আদার রস পেট ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। আদা মল পরিষ্কার করে এবং পাকস্থলী ও লিভারের কার্যক্ষমতা বাড়ায়। স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করে। আদার রস রক্তশূন্যতা দূর করে ও শরীর শীতল রাখে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে এবং রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা কার্যকরভাবে কমাতে সাহায্য করে আদা। রক্তনালির ভেতরের রক্ত জমাট বাঁধতে বাধা দেয় এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

আদা চাষে সঠিক জাত

আমাদের দেশে আদার যেসব জাত রয়েছে তার মধ্যে বারি আদা-১ অন্যতম। এটি উচ্চফলনশীল জাত।

আদা চাষে প্রয়োজনীয় জলবায়ু ও মাটি

১। আদা চাষ করার জন্য উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু পূর্ণ আবহাওয় দরকার। সামান্য ছায়াযুক্ত স্থানে আদা চাষ ভাল হয়।

২।  আদা চাষের জন্য উঁচু বেলে দো-আঁশ, বেলে ও এঁটেল দো-আঁশ মাটি উত্তম। জমিতে পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা থাকতে হবে।

আদা চাষে জমি প্রস্তুত

১। আদা চাষের জন্য জমিতে ভালো করে ৫/৬টি চাষ ও মই দিয়ে এবং মাটি ঝুরঝুরে করে জমি প্রস্তুত করতে হবে।

২। আদা চাষ করার জন্য উঁচু অথবা মাঝারী উঁচু জমি নির্বাচন করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে আদা চাষ করার জমিতে যেন পানি না জমে। 

আদা চাষে বীজ বপনের সময়

আদার বীজ বপনের সঠিক সময় মধ্য চৈত্র থেকে মধ্য বৈশাখ মাস। সঠিক সময়ে আদার বীজ বপন করতে হবে। 

আদা চাষে বীজ শোধন

পচন রোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বীজ আদা শোধন করতে হবে। এজন্য ৮ লিটার পানিতে ১৫-১৬ গ্রাম রিডোমিল গোল্ড বা এক্রোবেট এম জেড মিশিয়ে তাতে ১০ কেজি আদা বীজ আধা ঘন্টা পর্যন্ত ভিজিয়ে তুলে ছায়াযুক্ত স্থানে শুকিয়ে নেয়ার পর প্রস্তুকৃত জমিতে আদার বীজ রোপণ করতে হবে।

আদা চাষে বীজের পরিমাণ

হেক্টরপ্রতি প্রায় ২.০ থেকে ২.৫ টন আদার বীজ দরকার হয়।

আদা চাষে বীজ বপন

১। ছোট লাঙল বা কোদাল দিয়ে ৫০ সেন্টিমিটার দূরে দূরে নালা কেটে তাতে ১৫ সেন্টিমিটার দূরে দূরে ৮ সেন্টিমিটার গভীরতায় দু-তিনটি চোখসহ আদার টুকরা লাগাতে হবে। 

২। বীজ আদার ওজন ৪০ থেকে ৫০ গ্রাম হওয়া ভাল। সারিতে আদা লাগানোর পর সারির ওপর দিয়ে ৫-৬ সেন্টিমিটার পুরু করে খড় বা শুকনা পাতার আচ্ছাদন দিলে বীজ থেকে দ্রুত গাছ গজাবে।

আদা চাষে সার প্রয়োগ পদ্ধতি

ভালো ফলনের জন্য আদার জমিতে হেক্টরপ্রতি

১০ টন পচা গোবর

৩০০ থেকে ৩২০ কেজি ইউরিয়া

২৬০ থেকে ২৮০ কেজি টিএসপি

২৯০ থেকে ৩১০ কেজি এমওপি

১০০ থেকে ১২০ কেজি জিপসাম

সাথে প্রয়োজনে ১.৮ থেকে ২.২ কেজি বরিক এসিড এবং ৩.৫ থেকে ৪.০ কেজি জিংক সালফেট দিতে হবে। বীজ বপনের ৭ দিন আগে শেষ চাষের সময় জমিতে সম্পূর্ণ গোবর, টিএসটি, জিপসাম, বরিক এসিড, জিংক সালফেট ও অর্ধেক এমওপি সার প্রয়োগ করতে হবে। বীজ বপনের ৫০ দিন পর অর্ধেক ইউরিয়া সার প্রয়োগ করতে হবে। অবশিষ্ট ইউরিয়া ও এমপি সার সমান দুই ভাগে ভাগ করে বপনের ৮০ দিন পর একবার এবং ১১০ দিন পর আর একবার উপরি দিতে হবে।

আদা চাষে রোগ দমন

আদার জমিতে তেমন কোন রোগ-বালাই দেখা যায় না। তবে আদায় প্রধানত রাইজোম পচা রোগ দেখা দেয়। এ রোগে আক্রান্ত হলে মাটি বরাবর গাছের গোড়া পচে যায় এবং পাতা হলুদ হয়ে যায় ফলে আদা পচে গিয়ে দুর্গন্ধযুক্ত রস বের হয়।

প্রতিকার

রোগমুক্ত বীজ আদা রোপণ করা, একই জমিতে বারবার আদা চাষ না করা। জমিতে পানি নিকাশের ব্যবস্থা করা। প্রতি লিটার পানিতে তিন গ্রাম রিডোমিল গোল্ড মিশিয়ে মাটি ভিজিয়ে দিতে হবে।

আদা চাষে পোকা দমন

আদা গাছে কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ হতে পারে। কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকা দমনের কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে।

আদা চাষে অন্তবর্তীকালীন পরিচর্যা

আদা লাগানোর ২০ থেকে ২৫ দিনের মধ্যে চারা বের হয়। এসময় কয়েক বার নিড়ানি দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। গাছ কিছুটা বড় হলে গোড়ায় মাটি দিয়ে বেঁধে দিতে হবে।

আদা চাষে সেচ ব্যবস্থা

১। ভালো ফলনের জন্য আদার জমিতে মাটির অবস্থা বুঝে সেচের ব্যবস্থা করতে হবে।

২। জমি শুকিয়ে গেলে বা রস না থাকলে নালায় সেচ দিতে হবে। তবে খেয়াল রাখবেন আদা গাছ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না।

৩। আদা ক্ষেতে যদি জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় তাহলে অবশ্যই তা অপসারনের ব্যবস্থা করতে হবে। 

আদা তোলার সময়

চৈত্র-বৈশাখ মাসে লাগানো আদা অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে তোলার উপযোগী হয়। কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়ে আদা তুলতে হবে। আদা তুলে গায়ে লেগে থাকা মাটি পরিষ্কার করে সংরক্ষণ করতে হবে।

আদার জীবনকাল

আদা লাগানো থেকে ফসল সংগ্রহ পর্যন্ত ২৪০-২৬০ দিন।

আদা চাষে বীজ আদা সংগ্রহ

নির্বাচিত গাছ সম্পূর্ণভাবে শুকিয়ে যাওয়ার ১৫ থেকে ২০ দিন পর বীজ আদা সংগ্রহ করতে হবে।

আদার ফলন

উন্নত পদ্ধতিতে আদার চাষ করে হেক্টরপ্রতি ২০ থেকে ২৫ টন ফলন পাওয়া যায়।